শিশুদের ধুলো (Dust) এলার্জি খুব সাধারণ সমস্যা। পরিবেশে থাকা ধূলিকণা, ডাস্ট-মাইট (ছোট পোকা), পোলেন, কাপড়ের লোম বা পুরনো বইয়ের ধুলো — এসবের কারণে অ্যালার্জি হতে পারে।

ডাঃ স্বপন বিশ্বাস

শিশুদের ধুলো এলার্জির লক্ষণ

১. নাকের সমস্যা

    • বারবার হাঁচি
    • নাক দিয়ে জল পড়া
    • নাক চুলকানো
    • নাক বন্ধ হয়ে থাকা
    • রাতে নাক বন্ধ থাকার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া

২. চোখের সমস্যা

    • চোখ লাল হয়ে যাওয়া
    • চোখ চুলকানো
    • জল পড়া
    • আলো সহ্য না হওয়া

৩. শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা

    • কাশি (বিশেষ করে রাতে বা সকালে)
    • শ্বাসকষ্ট বা হাঁজলর মতো শোঁ-শোঁ শব্দ।
    • বুক ভারী লাগা

৪. ত্বকের লক্ষণ

    • র‍্যাশ বা লাল দাগ
    • একজিমা যাদের আছে, তাদের একজিমা বেড়ে যাওয়া।
    • ত্বক চুলকানো।

৫. অন্যান্য লক্ষণ

  • মনোযোগ কমে যাওয়া
  • বারবার ঠান্ডা লাগার মতো অনুভূতি বা শীত শীত ভাব।
  • ঘনঘন সর্দি হওয়া

ধুলো এলার্জির প্রতিকার এবং ঘরোয়া চিকিৎসা

    1. শিশুর পরিচর্যা
    2. খাবার ও ইমিউনিটি
    3. ধুলো কমানোর উপায়
    4. ওষুধ (ডাক্তারের পরামর্শে)

শিশুর পরিচর্যা

    • নাক পরিষ্কার রাখতে হবে, দরকারে স্যালাইন নাকের ড্রপ ব্যবহার করা যায়।
    • ধুলো বেশি থাকলে বাইরে বের হলে মাস্ক পরাতে হবে।
    • শিশুকে বেশি ধুলার মধ্যে খেলতে দেওয়া যাবে না।

খাবার ও ইমিউনিটি

  • নিয়মিত গরম জল ও পর্যাপ্ত মৌসুমি ফল খাওয়াতে হবে। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার সর্দি কমায়। (কমলা, আমলকি, পেয়ারা)।
  • বয়স এক বছরের বেশি হলে গরম/ উষ্ণ জলের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। (১ বছরের নিচে শিশুকে মধু দেবেন না)।
  • পর্যাপ্ত ঘুম ও জল পান করান।

ধুলো এলার্জি কমাতে গেলে ঘরের ধুলো কমান

১. ধুলো কমানোর জন্য নিয়মিত পরিষ্কার করা

    • ঝাড়ু নয় — ভেজা মপ দিয়ে ঘর পরিষ্কার করুন যাতে ধুলো না উড়ে।
    • প্রতিদিন ফার্নিচারের ধুলো ভেজা কাপড় দিয়ে মুছুন।
    • আলনা, টেবিল, জানালা—যেসব জায়গায় ধুলো জমে—সেগুলো সপ্তাহে ২–৩ বার পরিষ্কার করুন।

২. বিছানার জিনিস অ্যালার্জি-প্রুফ করুন (Dust Mite Control)

[ডাস্ট মাইট হলো অতি ক্ষুদ্র আকারের এক ধরনের মাইক্রোস্কোপিক পোকা যা সাধারণত ঘরের ধুলোতে থাকেএরা এত ছোট (প্রায় ০.২–০.৩ মিমি) যে খালি চোখে দেখা যায় না। ডাস্ট মাইট নিজে কামড়ায় না, কিন্তু এদের মল (droppings) ও মৃত দেহের অংশ থেকে তৈরি হওয়া প্রোটিন আমাদের শরীরে এলার্জি সৃষ্টি করতে পারে।]

    • ডাস্ট-মাইট সবচেয়ে বেশি থাকে বালিশ, মেট্রেস, কাঁথা, সোফা ও কার্পেটে।
    • চাদর, বালিশের কভার, কাঁথা ৭–১০ দিন অন্তর গরম জলতে ধুয়ে নিন।
    • মেট্রেস ও বালিশে ডাস্ট-মাইট প্রুফ কাভার ব্যবহার করুন।
    • রোদে বিছানা শুকানো খুব উপকারী।

৩. কার্পেট, পর্দা, সোফায় সতর্কতা

  • কার্পেট সম্ভব হলে বাদ দিন—এগুলো ধুলো ধরে রাখে।
  • মোটা কাপড়ের পর্দা নয়—লাইট ওয়েট পর্দা ব্যবহার করুন, যেন সহজে ধোয়া যায়।
  • সোফায় কাপড়ের কভার থাকলে নিয়মিত ধুয়ে নিন।

৪. নরম পুতুল

ধুলো এলার্জি থেকে মুক্তির উপায়

  • এগুলোতে ধুলো দ্রুত জমে।
  • শিশু যদি বেশি ব্যবহার করে— সপ্তাহে ১ বার ধুয়ে নিন, রোদে শুকান, না হলে প্লাস্টিক ব্যাগে রেখে দিন।

৫. ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখা

    • ঘরে বাতাস চলাচল থাকুক — জানালা খুলে রাখুন।
    • রাস্তায় ধুলো বেশি হলে জানালায় জালি বা ফিল্টার ব্যবহার করুন।
    • এয়ার পিউরিফায়ার থাকলে উপকার হয়। এক্ষেত্রে HEPA Filter ভাল।

৬. ছত্রাক (Mold) নিয়ন্ত্রণ

  • বাথরুম, রান্নাঘর, স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে বেশি ছত্রাক হয়।
  • ব্লিচ মিশ্রিত জল বা ফেনাইল দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
  • ঘরে আর্দ্রতা বেশি হলে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা ভালো।

৭. রান্নাঘর পরিষ্কার রাখুন

xr:d:DAFTP6VUovI:35,j:42706078509,t:22120100
  • সিঙ্ক শুকনো রাখবেন।
  • রান্নাঘরের ধোঁয়া বাইরে বের করার ব্যবস্থা (চিমনি/এক্সহস্ট ফ্যান) দরকার।
  • আবর্জনা নিয়মিত ফেলে দিন। জমিয়ে রাখবেন না।
  • কিচেন টাওয়েল নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।

৮. AC/ফ্যান/কুলারের যত্ন

  • AC ফিল্টার মাসে ১ বার পরিষ্কার করুন।
  • ফ্যানের ব্লেডে ধুলো জমে— সম্ভব হলে সপ্তাহে ১ বার মুছুন।
  • কুলারের ভিতরের অংশ পরিষ্কার রাখুন।

৯. পোশাক ও আলমারি

  • জামাকাপড় ধুলো-মুক্ত রাখতে আলমারি বন্ধ রাখুন।
  • নরম খেলনা, উল, গরম কাপড় আলাদা বক্সে রাখুন।

১০. পোষা প্রাণী থাকলে

  • বিছানা বা শিশুর ঘরে ঢুকতে দেবেন না।
  • নিয়মিত স্নান করান ও ব্রাশ করান।
  • পোষা প্রাণীর বিছানা ও বাসা পরিষ্কার রাখুন।

১১. গন্ধ/পারফিউম/ধূপ

  • ধূপ, আগরবাতি, রুম ফ্রেশনার, সিগারেট—অ্যালার্জির বড় উৎস।
  • এগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। শিশুকে এর কাছে যেতে দেবেন না। বাড়িতে শিশু থেকলে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করুণ। অন্য ঘরে খেলেও প্যাসিভ স্মোকিং হয়ে যায়।

১২. জানালার পোকামাকড় ও পোলেন কমানোর উপায়

  • জানালায় মশারি বা মেশ লাগান।
  • গাছের টবে জল জমতে দেবেন না।
  • গাছ নিয়মিত ছাঁটাই করুন।

ডাক্তারের পরামর্শে ঔষধ দেওয়া যায়

  • অ্যান্টিহিস্টামিন সিরাপ (যেমন সেটিরিজিন / লেভোসেটিরিজিন)।
  • নাজাল স্প্রে (ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া দেবেন ন…
  • হাঁপানির উপসর্গ থাকলে ইনহেলার/নেবুলাইজার (অবশ্যই ডাক্তার দেখিয়ে)।

ধুলো এলার্জি মনে হলে কখন ডাক্তার দেখাবেন?

  • শিশুর শ্বাসকষ্ট বাড়লে
  • বারবার কাশি ও বুকে ব্যথা হলে।
  • চোখ ফুলে যাওয়া বা ত্বকে মারাত্মক র‍্যাশ।
  • বারবার ঘুম ভেঙে গেলে বা খাওয়ায় সমস্যা হলে।

 

 

Spread the love and share